প্রকাশিত: ৪ ঘন্টা আগে, ১২:৩২ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
গাজীপুর প্রতিনিধি : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ঘোষণা আসার পরই গাজীপুরের গণপরিবহনে যেন ভাড়ার নতুন হিসাব শুরু হয়েছে। নতুন ভাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণের আগেই সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে চন্দ্রা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা রুটে ৪০ টাকার ভাড়া ৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। বাড়তি ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানালে কোথাও কোথাও চালক-সহকারীদের সঙ্গে যাত্রীদের তর্কাতর্কি ও ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, নতুন ভাড়া নির্ধারণের আগেই পরিবহন শ্রমিকেরা কার নির্দেশে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায়?
সোমবার সকাল থেকে চন্দ্রা, কোনাবাড়ী, গাজীপুর চৌরাস্তা ও আশপাশের এলাকায় গণপরিবহনে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে কোনো কোনো বাসে আগের ভাড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা যোগ করা হচ্ছে। চন্দ্রা থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আগে ৪০ টাকা নেওয়া হলেও কয়েকটি বাসে ৫০ টাকা নেওয়া হয়েছে। মাঝপথের বিভিন্ন স্টপেজ থেকেও নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
চন্দ্রা থেকে চৌরাস্তা যাচ্ছিলেন ফজলুল হক। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়লে ভাড়া সমন্বয় হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সরকারিভাবে নতুন ভাড়া নির্ধারণের আগেই ১০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হলো কেন? আমরা যারা প্রতিদিন বাসে যাতায়াত করি, তাদের মাস শেষে বাড়তি কয়েক শ টাকা খরচ হবে। আরেক যাত্রী বলেন, বাসে উঠলেই বলা হচ্ছে তেলের দাম বেড়েছে, তাই ভাড়াও বেড়েছে। কিন্তু নতুন ভাড়ার কোনো তালিকা দেখানো হচ্ছে না। একেক বাসে একেক রকম ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে চালক-হেলপারের সঙ্গে যাত্রীদের কথা-কাটাকাটি হচ্ছে। তবে পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, তেলের দাম বাড়ায় গাড়ি পরিচালনার খরচ বেড়েছে। চন্দ্রা-চৌরাস্তা রুটের এক চালক বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর গাড়ির খরচ বেড়েছে। মালিকের জমা, জ্বালানি, মেরামত—সবকিছুর খরচ আছে। তবে ভাড়া সরকারিভাবে যেটা নির্ধারণ করবে, সেটাই নেওয়া উচিত। চালকের নিজের সিদ্ধান্তে ভাড়া বাড়ানো ঠিক নয়।
আরেক চালক বলেন, যাত্রীরা আমাদের সঙ্গে তর্ক করছেন। কিন্তু ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চালকের হাতে নেই। মালিক সমিতি ও সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করবে, সেটাই কার্যকর হবে। তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন মালিকদের ওপর যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। গাজীপুর জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি বলেন, তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে ভাড়া সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। তবে নতুন ভাড়া নির্ধারণের আগে কোনো চালক বা শ্রমিক নিজেদের মতো করে বাড়তি ভাড়া নিতে পারেন না। সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করবে, মালিক সমিতি সেটিই বাস্তবায়ন করবে। তিনি আরও বলেন, যাত্রীদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা বা অসৌজন্যমূলক আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। তবে নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়েও নজরদারি রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন মালিকদের খরচ বাড়ার বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু নতুন ভাড়া নির্ধারণের আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ তৈরি হলে তা নিয়ে বিরোধ হওয়াটাও স্বাভাবিক। ফলে ভাড়া সমন্বয়ের প্রক্রিয়ায় যেমন পরিবহন খাতের বাড়তি ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন, তেমনি সাধারণ যাত্রীদের সামর্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি উঠেছে। গাজীপুর শিল্পাঞ্চল হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পোশাকশ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষ চন্দ্রা, কোনাবাড়ী, চৌরাস্তা, বোর্ডবাজারসহ বিভিন্ন সড়কে গণপরিবহনে চলাচল করেন। তাদের বড় একটি অংশের মাসিক আয়ের ওপর পরিবারের ব্যয় নির্ভর করে। ফলে প্রতিদিনের যাতায়াতে ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তি ব্যয় হলেও মাস শেষে সেটি তাঁদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
যাত্রীদের প্রশ্ন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে ভাড়া বাড়াতে হলে সরকার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সেটি হবে-এটাই নিয়ম। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই যদি রুটভেদে পরিবহনগুলো নিজেদের মতো ভাড়া বাড়িয়ে নেয়, তাহলে যাত্রীদের অভিযোগ শোনার দায়িত্ব কার? একই সঙ্গে নতুন ভাড়া নির্ধারণের পরও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কার্যকর নজরদারি থাকবে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় গাজীপুরের যাত্রীদের দাবি, দ্রুত নতুন ভাড়া নির্ধারণ করে তা প্রতিটি রুটে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হোক। বাসে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে যাত্রী-শ্রমিক বিরোধও অনেকটা কমানো সম্ভব হবে। অন্যদিকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদেরও নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে নিজেদের মতো করে টাকা না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
মন্তব্য করুন