প্রকাশিত: ৯ ঘন্টা আগে, ০৪:১২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বিশেষ প্রতিনিধি: জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতি এক ধরনের অস্বস্তিকর বৈপরীত্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। যে আন্দোলন একসময় কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়েই এখন নতুন রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হচ্ছে। এমনকি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু রাজনৈতিক শক্তি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে তাদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নে চাপ দিতে রাজপথে আবারও অভ্যুত্থানের হুমকি দিচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বিএনপি সরকার তাঁদের প্রত্যাশিত সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে আবারও আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের পথে যাওয়া হতে পারে। অথচ তাঁদের প্রস্তাবিত সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে এখনো পূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
এখানে প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমায় আটকে নেই। বরং গণতান্ত্রিক আলোচনার জায়গায় রাজপথের শক্তিকে বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর প্রবণতাই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার কোনো রাজনৈতিক দলের হুমকি বা চাপের কাছে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব ও ক্ষমতা সমর্পণ করতে পারে না। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান হয় আলোচনা, নির্বাচন, সংসদীয় প্রক্রিয়া ও জনগণের রায়ের মাধ্যমে—রাজপথের ভয় দেখিয়ে নয়।
জুলাই অভ্যুত্থান কোনো এক ধরনের রাজনৈতিক নিপীড়ন সরিয়ে তার জায়গায় আরেক ধরনের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘটিত হয়নি। অথচ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আচরণে এমন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে কেউ কেউ নিজেদের এবং নিজেদের দলকে জুলাইয়ের চেতনার একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। এটি জুলাইয়ের মূল আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল প্রচলিত সুবিধাবাদী ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান। সেই আন্দোলনের পর যদি আবার এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট দলের সাংবিধানিক প্রস্তাব গ্রহণ না করলে দেশকে নতুন করে অস্থিতিশীল করার হুমকি দেওয়া হয়, তাহলে সেটি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক সমঝোতার উদাহরণ হতে পারে না। বরং এটি রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগেরই একটি রূপ।
এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে এ ধরনের সাদৃশ্যও লক্ষণীয়। গত ১৮ জুলাই বরিশালের এক সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও সতর্ক করে বলেছেন, তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার না হলে দেশকে আবারও আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে হবে।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—দেশের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ কি রাজনৈতিক সংলাপ ও সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, নাকি রাজপথের শক্তি ও চাপের মাধ্যমে?
হুমকি দিয়ে কখনো একটি দেশের সংবিধান রচিত হয় না। সংবিধান একটি জাতির মৌলিক রাজনৈতিক চুক্তি। এটি তৈরি ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা, সংসদীয় বিতর্ক, জনগণের অংশগ্রহণ এবং যতটা সম্ভব জাতীয় ঐকমত্য। কোনো রাজনৈতিক দল যদি এমন দাবি করে যে, নির্বাচিত সরকারের বৈধতা তাদের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল, তাহলে তা গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
রাজনৈতিক সংঘাতের এই প্রবণতা কেবল বক্তৃতা বা বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ নেই। মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাম্প্রতিক কিছু কর্মসূচি ও স্লোগান নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার উপায় হলো যুক্তি, মতাদর্শ, সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী প্রতিযোগিতা। প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সংগঠকদের উদ্দেশ্য যা-ই হোক, এ ধরনের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতার মধ্যকার সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে। একদিকে যখন বারবার নতুন অভ্যুত্থানের হুমকি দেওয়া হয়, অন্যদিকে যখন মাঠে প্রতিপক্ষবিরোধী আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচি দেখা যায়, তখন সামগ্রিকভাবে একটি উদ্বেগজনক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়। এতে এমন ধারণা জন্মাতে পারে যে, রাজপথের শক্তিই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
তবে এই সংকটের শিকড় আরও গভীরে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়নের প্রক্রিয়াই এ বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুরু থেকেই এই সনদকে ঘিরে সর্বজনীন অংশগ্রহণ ও জাতীয় ঐকমত্য নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ প্রক্রিয়াকে শুরু থেকেই অনেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক না হওয়ার অভিযোগে সমালোচনা করেছেন। দেশে নিবন্ধিত ৫২টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ২১টি দলকে আনুষ্ঠানিক সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর পাশাপাশি নয়টি অনিবন্ধিত সংগঠনকে আলোচনায় যুক্ত করা হয়। ফলে দেশের অনেক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলই সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে আলোচনার মূল টেবিলের বাইরে থেকে যায়।
জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়ায় দেশের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোই অংশগ্রহণের সুযোগ পায় না, সেই প্রক্রিয়ার সর্বজনীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পরে সংলাপে অংশ নেওয়া কয়েকটি রাজনৈতিক দলও শেষ পর্যন্ত জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেনি। ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্ক্সবাদী) এবং বাংলাদেশ জাসদ সনদে স্বাক্ষর করেনি। এনসিপিও শুরুতে এতে স্বাক্ষর করেনি।
ফলে যে সনদ নিজের আলোচনার পরিসরেই সব রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন অর্জন করতে পারেনি, সেটিকে কীভাবে গোটা জাতির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে—এ প্রশ্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে ওঠা স্বাভাবিক। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, এই সনদকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক রূপান্তর ও নির্বাচন প্রক্রিয়াকে এক ধরনের চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে অবৈধ দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতেও এই বিতর্কের একটি দিক উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের স্বার্থে তাঁরা সে সময় অনেক বিষয় নিয়ে নীরব ছিলেন এবং সংস্কারের অজুহাতে নির্বাচন যাতে আটকে না যায়, সে জন্য তাঁরা আপস করে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপির পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ‘সংস্কারের জন্য শ্বেতশুভ্র কেশের আমার কিছু বড় ভাই বুদ্ধিজীবী বিদেশ থেকে অবতরণ করেছিলেন। তাঁরা মাথায় টুকরি ভর্তি করে অলৌকিক কিছু সংস্কার নিয়ে দেশে অবতরণ করলে পরে আমরা সংস্কার কমিশনে আলাপ-আলোচনা করতে করতে এই জুলাই জাতীয় সনদটা প্রণয়ন হয়েছে।’
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোনো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব হলো একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা। আর সংবিধান সংস্কারের মতো রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে নির্বাচিত সংসদের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গায় গণভোটের প্রস্তাবও বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। গণভোট নিঃসন্দেহে একটি স্বীকৃত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। কিন্তু এটি রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প হতে পারে না। নির্বাহী ক্ষমতার কাঠামো, সংসদের ভূমিকা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কিংবা মৌলিক অধিকার—এ ধরনের জটিল সাংবিধানিক প্রশ্নকে কেবল ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটে সীমাবদ্ধ করলে বিষয়গুলোর বহুমাত্রিকতা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
গণভোটের আগে রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ছাড়া গণভোটকে যদি কৃত্রিম ঐক্য তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা বিভাজন আরও বাড়াতে পারে। জনগণের ভোট রাজনৈতিক মতৈক্যকে অনুমোদন দিতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক মতৈক্য তৈরি করার কাজটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোকেই করতে হয়।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সংকট তাই শুধু সাংবিধানিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জুলাই অভ্যুত্থানের মালিকানা ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা। ছাত্র-জনতার আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি। ফলে আন্দোলনের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী নিজেদেরকে জুলাইয়ের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
এর ফলে সাধারণ মানুষের ত্যাগ ও অংশগ্রহণ থেকে জন্ম নেওয়া একটি গণ-অভ্যুত্থান ধীরে ধীরে দলীয় রাজনৈতিক মালিকানার বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় আন্দোলনগুলোর শক্তি কখনো ব্যক্তিগত বা দলীয় মালিকানায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সেখানে দেশের জন্য মানুষের ত্যাগই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানও কোনো একক দল, মতাদর্শ বা প্রজন্মের একচ্ছত্র সম্পত্তি হতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক প্রস্তাবের সমালোচনা করাকে যদি জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে সেটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য বিপজ্জনক। কারণ একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সব নাগরিকের। তার ওপর কোনো দল বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া মালিকানা থাকতে পারে না।
জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে নতুন নতুন মেরুকরণেরও সৃষ্টি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে এনসিপির আত্মপ্রকাশকে অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও, একটি বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের দৃশ্যমান নেতৃত্ব থেকে সরাসরি একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
যাঁরা প্রচলিত ক্ষমতার রাজনীতি বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ আবার সেই পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো, প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির চক্রে প্রবেশ করছেন কি না—এ প্রশ্নও এখন জনপরিসরে আলোচিত হচ্ছে। একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রশ্নের জবাব দেওয়া জরুরি। কারণ নতুন রাজনীতির দাবি শুধু নতুন স্লোগানে নয়, আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত হতে হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির দৃশ্যমান ঘনিষ্ঠতাও তাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির দাবিকে কিছুটা প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে রাজনীতির বাইরে রাখার দাবি কিংবা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পুনর্ব্যাখ্যার কিছু বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মতভেদ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। যারা নিজেদের নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁদের জন্য মিত্র নির্বাচন, রাজনৈতিক মূল্যবোধ এবং ইতিহাসের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সময়ে জুলাই-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার অভিযোগ এবং ‘মব জাস্টিস’-এর মতো ঘটনাও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যারা জুলাই অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার দাবি করেন, তাঁদের কাছ থেকে নাগরিক অধিকার, বহুত্ববাদ এবং আইনের শাসন রক্ষায় আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশিত।
আরও একটি বিষয়ও উপেক্ষা করা যায় না। যে আন্দোলন বিশেষ সুবিধা, বৈষম্য ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধেও পরবর্তী সময়ে নানা অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়া কিংবা ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগানোর অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা জুলাই আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
একটি ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি তখনই হয়, যখন তার নৈতিক শক্তিকে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পরিবর্তে দলীয় রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য ব্যবহার করা হয়। জুলাইয়ের ভাষা যদি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার বদলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপ দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সেই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই বাস্তবতায় বারবার নতুন অভ্যুত্থানের হুমকি কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না। বরং এটি নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট না পাওয়া কোনো রাজনৈতিক শক্তির রাজপথকে চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা হিসেবে দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক ভেটো দেওয়ার অধিকার নেই। একইভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকারের ওপরও কোনো গোষ্ঠীর স্থায়ী মালিকানা থাকতে পারে না।
একটি নির্বাচিত সরকার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা গ্রহণ না করলে দেশকে অস্থিতিশীল করার হুমকি দেওয়ার নৈতিক ভিত্তিও কারও নেই। কোনো প্রস্তাবের পক্ষে যদি সত্যিই জনসমর্থন থাকে, তাহলে গণতন্ত্রে তার স্বাভাবিক পথও খোলা আছে—নির্বাচনে অংশ নেওয়া, জনগণের সমর্থন অর্জন করা, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই। আলোচনায় কোনো প্রস্তাব নিজের পক্ষে না গেলে আবার অভ্যুত্থানের ডাক দেওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি আস্থার প্রকাশ নয়। বরং এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থাকেই প্রকাশ করে।
জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা সংস্কারের কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাবের বিরোধিতা করা নয়। বরং ব্যালট, সংসদ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে রাজপথের শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করাই হতে পারে সেই চেতনার প্রকৃত বিচ্যুতি।
বাংলাদেশের মানুষ সাংবিধানিক সংস্কার চায়—কিন্তু তা হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নির্বাচিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। জনগণ এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে, যেখানে পরিবর্তনের পথ হবে ভোট, আলোচনা ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর; রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল বা অনবরত অভ্যুত্থানের হুমকিনির্ভর নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ১৯ জুলাই ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘রক্তাক্ত জুলাই : প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘জুলাই চেতনা বিক্রি করে বেশি দিন রাজনীতি করা যাবে না। জুলাই কারো একার সম্পদ নয়। এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে এর মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
এই বক্তব্যের মধ্যেই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য নিহিত আছে। জুলাই যদি সত্যিই একটি গণ-অভ্যুত্থান হয়ে থাকে, তবে তার উত্তরাধিকারও হতে হবে গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, আইনের শাসন ও জনগণের সার্বভৌমত্বের পক্ষে। কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে জুলাইকে ব্যবহার করা হলে তা শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের মূল চেতনাকেই দুর্বল করবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বিরোধিতাকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করা, কিন্তু বিরোধিতার নামে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অকার্যকর হতে না দেওয়া। সংস্কারের প্রয়োজন থাকলে তা নিয়ে আলোচনা হোক, মতপার্থক্য থাকলে সংসদে বিতর্ক হোক, জনগণের সমর্থন প্রয়োজন হলে নির্বাচন হোক। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হিসেবে বারবার অভ্যুত্থানের হুমকি দেওয়া হলে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে না; বরং রাষ্ট্রকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে।
জুলাইয়ের প্রকৃত শিক্ষা তাই নতুন করে ক্ষমতার মালিকানা দাবি করা নয়; বরং জনগণের হাতে ক্ষমতার প্রকৃত মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া। সেই মালিকানা নিশ্চিত করার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ হলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, মতভিন্নতার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা এবং জনগণের ভোটকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সর্বোচ্চ ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করা।
মন্তব্য করুন