প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০১:০৫ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

চাঁদপুরে পৈতৃক সম্পত্তিতে ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধ, আদালতের ১৪৫ ধারায় নির্মাণকাজ স্থগিত

চাঁদপুর প্রতিনিধি: চাঁদপুর সদর উপজেলার পাইকদী (খান বাড়ি) গ্রামে পৈতৃক ও ক্রয়কৃত সম্পত্তিতে ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ বিরোধের জেরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় মামলা দায়ের হওয়ায় আদালত সাময়িকভাবে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায় অভিযোগকারী মো. সাঈদ হাসান খান, যিনি ঢাকায় প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক আজকালের খবর-এ কর্মরত, দাবি করেন তিনি, মৃত আবুল হোসেন খানের ছেলে মো. সাঈদ হাসান খান পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি এবং বড় ভাই লোকমান হোসেন খান ও তিন বোনের কাছ থেকে ক্রয়কৃত জমির ওপর বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। নির্মাণকাজ শুরু হলে তার সেজু ভাই মো. আবু হানিফ খান বাধা দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগকারীদের দাবি, নির্মাণকাজ চলাকালে আবু হানিফ খান ও তার সহযোগীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন এবং নির্মাণাধীন স্থাপনার কিছু অংশ ভাঙচুর করেন। পরে তিনি আদালতে ১৪৫ ধারায় আবেদন করলে আদালত তদন্তের স্বার্থে দুই মাসের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। এতে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, বাড়ি নির্মাণের জন্য আগে থেকেই রড, সিমেন্ট, বালুসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ক্রয় করা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় এসব সামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর একাংশের মতে, এর ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধের অভিযোগ

অভিযোগকারীরা দাবি করেন, আবু হানিফ খান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ, গালাগালি, মারধরের চেষ্টা, হুমকি এবং সালিশ বৈঠকের মতো একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে একাধিকবার সালিশ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

স্থানীয় এক ক্ষুদ্র ফার্মেসি ব্যবসায়ী ও প্যারা-ডাক্তার ঝুটনের অভিযোগ, তাকে একাধিকবার অপমান, গালাগালি ও মারধরের চেষ্টা করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আশপাশের মানুষই এসব ঘটনার সাক্ষী। আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ ও মারধরের চেষ্টা করা হয়েছে।"

রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, আবু হানিফ খান জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশি চাচাতো ভাই মো. খোরশেদ খন্দকার একটি রাজনৈতিক ব্যানার টাঙানোর পর সেটি অপসারণের জন্য তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে হুমকিতে বলাহয় ২৪ ঘন্টার মধে ব্যানার না শরালে এলাকায় থাকতে না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

আত্মীয়দের ওপর সামাজিক চাপের অভিযোগ

একই পরিবারের সদস্য মোহাম্মদ আলী ও তার স্ত্রী অভিযোগ করেন, তারা আবু হানিফ খানের ছোট ভাই মো. সাঈদ হাসান খানের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কারণে তাদের গালাগালি ও মারধরের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রতিবেশী ভাতিজা মো. সুজন খানের স্ত্রীও একই কারণে হেনস্তার শিকার হন। বর্তমানে সাঈদ হাসান খান ও তার পরিবার প্রতিবেশী মো. খোরশেদ খন্দকারের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এ কারণে খোরশেদ খন্দকারকেও নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

ছোট ভাইয়ের অভিযোগ

এ বিষয়ে আবু হানিফ খানের ছোট ভাই মো. সাঈদ হাসান খান বলেন, "আমার ভাই আমার পৈতৃক ও ক্রয়কৃত সম্পত্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে আমাকে এলাকায় বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছেন। প্রতিবেশীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে যেন কেউ আমাকে আশ্রয় না দেয়, সেই চেষ্টা চলছে।"

অভিযুক্তের বক্তব্য

এ বিষয়ে মো. আবু হানিফ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার কিছু শর্ত পূরণ না হলে ওই জমিতে কোনো ধরনের নির্মাণকাজ করতে দেওয়া হবে না।

তার দাবি, নিজের নামে থাকা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করে দিতে হবে। এছাড়া ছোট ভাইয়ের ক্রয়কৃত জমি থেকে তিন শতক জমি দিতে হবে। একই সঙ্গে পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত ৪ শতক ৯৪ পয়েন্ট সম্পত্তির যে অংশ বর্তমানে পুকুর হিসেবে রয়েছে, সেটি ছোট ভাইকে নিজ খরচে ভরাট করে দিতে হবে। অন্যথায় তিনি সেখানে বাড়ি নির্মাণ করতে দেবেন না বলে জানান।

যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, এসব দাবির আইনগত ভিত্তি কী, তখন তিনি বলেন, "আমার নামে ঋণ আছে। আমার খালি জায়গা ভরাট করে দিতে হবে। এগুলো না করলে আমি কাজ করতে দেব না।" তবে এসব দাবির পক্ষে তিনি কোনো আইনি দলিল বা ভিত্তি দেখাতে পারেননি।

আরেক উত্তরাধিকারীর সম্পত্তি নিয়েও বিরোধের অভিযোগ

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মৃত সুলতান আহমেদ খানের স্ত্রী ও কন্যা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও সেখানেও আবু হানিফ খান বাধা দেন। তাদের অভিযোগ, তিনি বলেন, "এতদিন কোথায় ছিলেন? এখানে কাউকে বাড়ি নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।" ফলে তারাও নিজেদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি ভোগদখল করতে পারছেন না বলে দাবি করেন।মৃত সুলতান খানের  কন্যা আরও বলেন, "আমাদের বাবা মৃত্যুর আগে আমাদের জন্য তেমন কোনো সম্পদ রেখে যেতে পারেননি, যা ব্যবহার করে আমরা বসবাস করতে পারি। বর্তমানে আমরা ঢাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকি, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। তাই মৃত সুলতান খানের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে যে সম্পত্তি আমরা পেয়েছি, সেখানে একটি বাড়ি নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাই। কিন্তু এ বিষয়ে মো. আবু হানিফ খানের সঙ্গে কথা বললেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের প্রাপ্য সম্পত্তি বুঝিয়ে দিচ্ছেন না এবং সেখানে বাড়ি নির্মাণেও বাধা দিয়ে আসছেন

জ্যেষ্ঠ আত্মীয়ের বক্তব্য

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য সাত্তার খান বলেন, "পারিবারিক ঈর্ষা ও বিরোধের কারণেই ছোট ভাইকে নিজ জমিতে বাড়ি নির্মাণ করতে দেওয়া হচ্ছে না। অতীতে মো. আবু হানিফ খান ও তার স্ত্রীর দায়ের করা বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার ঘটনায় ও পারিবারিক বিরোধে পরিবারের জমিজমা, ঘরবাড়ি ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো বিভিন্ন দাবি তোলা হচ্ছে।"

স্থানীয় আরেক বাসিন্দাকে সামাজিকভাবে একঘরে করার অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, সম্প্রতি প্রতিবেশী মো. কাশেম খান ও তার ছেলে মো. রাশেদ খানের বিরুদ্ধেও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা সাঈদ হাসান খানের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখায় স্থানীয়ভাবে সালিশ ডেকে তাদের একঘরে করার হুমকি দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে কাশেম খান বলেন, "আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চাই। আল্লাহ যেন ন্যায়বিচার করেন।"

আদালতের মামলার বিষয়

সংযুক্ত অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আবু হানিফ খান ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় আবেদন করে দাবি করেছেন, জমির দখল নিয়ে বিরোধ থাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগকারীদের দাবি, আবেদনপত্রে উত্থাপিত তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং বৈধভাবে প্রাপ্ত ও ক্রয়কৃত সম্পত্তিতে নির্মাণকাজ বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই মামলাটি করা হয়েছে।

বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি

এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, পারিবারিক এই বিরোধ দ্রুত আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করে প্রকৃত মালিকদের অধিকার নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে বিরোধের স্থায়ী সমাধান এবং এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

মন্তব্য করুন