প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১০:৩৪ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

বিগত সরকারগুলোর দায়ই এ খাতের সমস্যা বাড়িয়েছে

বিদ্যুতের পুঞ্জিভূত সংকটে শুধু মন্ত্রীকে দোষারোপ কতটা যৌক্তিক

বিশেষ প্রতিনিধি : কে না জানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্যসব রাজনীতিবিদের মত কাজে-কর্মে এখন আর গতানুগতি নন। কে না জানে রাষ্ট্রের শীর্ষ নির্বাহী হয়েও তিনি এখন অতি সাধারন জীবনযাপন করেন। কথার চেয়ে কাজের চর্চার মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিয়ে চলেছেন। তার সাদাসিধে ব্যক্তিত্ব আর স্বচ্ছতা সবার জন্যই অনুকরণীয়। সম্প্রতি দেশের বিদ্যুত্ পরিস্থিতি ও সংকট নিয়ে নিজের অকপট স্বীকারুক্তি তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে তিনি সরকার প্রধান হিসেবে বিদ্যমান সংকটকে মেনে নিচ্ছেন আবার তা থেকে উত্তোরণে সর্বশক্তি দিয়ে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। 
রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিএনপি; কিন্তু তাই বলে পুরো বিদ্যুত্ সংকটটি এই সরকারের তৈরি-বিষয়টি এমন নয়। তারপরও প্রধানমন্ত্রী জাতির কাছে যেভাবে সংকটের সরল স্বীকারুক্তি করেছেন, তাতে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনন্য উদাহরণ তৈরি করে তিনি ছোট হয়ে যান নি; বরং এর মধ্য দিয়ে তিনি আরও বড় মনের পরিচয় দিয়েছেন। এটিই উন্নত রাজনীতির মহিমান্নিত দিক।

এমন চর্চা যেমন তার মহত্প্রাণ দৃষ্টিভঙ্গীর সরল প্রকাশ; তেমনি সংসদের মত রাষ্ট্রের আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থলে বিদ্যুত্ সংকটের একক দায় ইঙ্গিত করে খোদ বিদ্যুত্মন্ত্রীকে নিয়ে কিছু বিতর্কিত মন্তব্যও নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উদারতার প্রশংসা যেমন তার প্রাপ্য, তেমনি কেবিনেটের কারও নিন্দা বা সমালোচনাও প্রকারন্তরে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা নিন্দা করার শামিল। কারণ তিনিই সরকার প্রধান। তার কোনো মন্ত্রীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে অকারণ তাকে দায়ী করা হলে, এটিও প্রধানমন্ত্রীর অসম্মানের কারণ হতে পারে। 
জাতীয় সংসদ মানুষের যাবতীয় প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্ধু। কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেছে, সেখানে বিদ্যুত্মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একটি মন্তব্য করা হয়েছে যে, ‘মাননীয় মন্ত্রীর কাছ থেকে শুনি, তার লম্বা, তাই বিদ্যুত্ চলে যায়।’ প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করার বিপরীতে বিদ্যুত্মন্ত্রীর এমন বিবৃতি উদ্বৃত করে অস্মানজনক মন্তব্য বিভিন্ন মহলে বেশ বির্তকের জন্ম দিয়েছে। অনেকে এ ধরণের মন্তব্যকে খুবই দু:খজনক ও অপ্রত্যাশিত বলে সমালোচনা করছেন। 
সংসদের একজন সাধারন এমপিও সম্মানীত। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তারা সংসদে নানান বিষয়ে কথা বলেন, বির্তক করেন; আবার সমাধানেরও পথ তৈরি করেন। এই যে সংসদের সৌন্দর্য, এটি নষ্ট হয়, যখন সংসদেরই কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি অন্যায্য ভাবে কোনো বিষয়ে কাউকে দায় দেন। কোনো একটি সংকটের যৌক্তিক কারণকে উপেক্ষা করে যখন ব্যক্তির মর্যাদাহানীর লক্ষ্যে পক্ষপাতদুষ্ট তীর্যক মন্তব্য করা হয়, তখন সেটি পুরো সরকারব্যবস্থার কাঠামো, নেতৃত্বে আর ইমেজে গিয়ে আঘাত করে।
আমরা যদি বিদ্যুত্ সংকট নিয়েই কথা বলি, তাহলে এর নেপথ্যের কারণও আমাদের জানা দরকার। একজন মন্ত্রী হচ্ছেন একটি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নির্বাহী। আবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সবার শীর্ষ নির্বাহী। বিদ্যুত্ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হিসেবে তার দায় অবশ্যই আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও বুঝতে হবে যে, তিনি কোনো একক স্বত্তা নন। তিনিও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি টিমের সদস্য। আর মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হিসেবে তিনি যখন কোনো কথা বলেন, তিনি মন্ত্রণালয়ের তার সহকর্মীদের মাধ্যমে অবগত হয়েই কিছু বলেন। তার সহকর্মীরাও তাকে একটি পরিস্থিতি সর্ম্পকে পুংখানুপুংখ ভাবে, কারিগরি ও অবকাঠামোগত সক্ষমত-দুর্বলতা পর্যালোচনা করেই অবহিত করে থাকেন। আর তিনিও সেভাবে প্রস্তুত হন।
দেশে বিদ্যুত্ সংকট রয়েছে। এটি কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু কেন এই সংকট? কীভাবে এটি এই পর্যায়ে এলো? কারা এর নেপথ্যে? নিশ্চয়ই এসব প্রশ্নের জবাব রয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র সাত মাস হলো। বিদ্যুত্ খাতের মত একটি বিশাল খাতের সংস্কার কিংবা এর কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে কাজ করার সুযোগও এখন হয়ে উঠেনি সরকারের। এটিই বাস্তবতা। একটি উদীয়মান অর্থনীতি, বিরাট শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বহুমাত্রিকতায় বিদ্যুতের অসীম চাহিদার বিপরীতে বিদ্যমান অবকাঠামো, কারিগরি দুর্বলতা, জনবল ও জাতীয় বিদ্যুত্ সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যাসহ নানান জটিল দিক রয়েছে, সেগুলো বিদ্যুত্ সঞ্চালন কিংবা বিতরণ ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত কী সংকট তৈরি করছে-সেটি আমরা আমজনতা কতটুকুই বা জানি। এর সঙ্গে অনেক কারিগরি ও প্রকৌশলগত বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। সেগুলো নিশ্চয়ই একবাক্যে বলা সম্ভব নয়। 
অথচ পুরো বিদ্যুত্ খাতের সংকট, ত্রুটিবিচ্যুতি কিংবা দুর্বলতাগুলো না জেনে একবাক্যে বিদ্যুত্মন্ত্রীকে দোষারোপ করে মন্তব্য করা-সত্যিকার অর্থে পুরো সরকারকে, প্রধানমন্ত্রীকে, মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টাকে খাটো করা ছাড়া আর কিছুই নয়। সংসদের মত একটি দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে এ ধরণের মন্তব্য কেবল অবিচার-অন্যায্যই নয়; বরং অসম্মানের। বিদ্যুত্মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কেবিনেটের একজন সিনিয়র সদস্য। নিজে একজন মুুক্তিযোদ্ধা। অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। আবার বয়োজৈষ্ঠও। সংসদে সমস্যা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হলে কারও আপত্তি থাকবে না। বিদ্যুত্ সংকট কীভাবে মোকাবেলা করা যায়, এর নেপথ্যের প্রকৃত কারণ সবারই জানার অধিকার রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র মন্ত্রনালয়ের একজন মন্ত্রী হওয়ার কারণে সব দায় তাকে দিয়ে তীর্যক মন্তব্য করার অর্থ হলো-একজন সিনিয়র মন্ত্রীর প্রতি অবিচার করা। এটি চরম অপমানজনকও। এতে তিনি মর্মাহত হয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরকম মন্তব্য বেশ মুখরোচক ও ‘ভিউবর্ধনমূলক’ ঠিকই কিন্তু এর মধ্য দিয়ে অবশ্যই প্রকৃত কারণ উপেক্ষা করা হয়েছে।
এ লেখাটি লিখতে গিয়ে বিদ্যুত্ সংকটের নেপথ্যের কারণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুত্ এলাকায় কেন এত ঘন ঘন বিদ্যুত্ বিভ্রাট হচ্ছে? এর পেছনে কি শুধু উত্পাদন ঘাটতি, নাকি বিতরণ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাও বড় কারণ? এসব কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, পল্লী বিদ্যুত্ বিতরণ ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো দীর্ঘ ওভারহেড বিদ্যুত্লাইন। গ্রামাঞ্চলে একটি ফিডারকে অনেক দূর পর্যন্ত বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে হয়। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সমস্যা দেখা দিলে তা শনাক্ত করা এবং দ্রুত মেরামত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ পল্লী বিদ্যুত্ লাইনে বিভ্রাটের পেছনে প্রধানত চার ধরনের সমস্যার কথা জানা যায়। এগুলো হচ্ছে-পরিবেশগত প্রভাব, কারিগরি সীমাবদ্ধতা, ফল্ট শনাক্ত ও মেরামতে বিলম্ব, ওভারলোড ও যন্ত্রপাতি বিকল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন ও সরবরাহের ঘাটতি।
গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ বিদ্যুত্লাইন খোলা পরিবেশে স্থাপিত। অনেক ক্ষেত্রে ঝোপঝাড়, গাছপালা ও কৃষিজমির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ওভারহেড লাইন চলে গেছে। ঝড় বা প্রবল বাতাসে গাছের ডালপালা বিদ্যুত্লাইনের ওপর পড়ে শর্ট সার্কিট তৈরি করতে পারে। আবার বৃষ্টি, বজ্রপাত কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কারণে পিন ইনসুলেটর, ট্রান্সফরমারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ট্রিপ করতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ দীর্ঘ লাইনে সংঘটিত ফল্টের বড় অংশই সিঙ্গেল লাইন-টু-গ্রাউন্ড। প্রায় ৭৫ শতাংশ ফল্ট এই ধরনের হতে পারে, যার সঙ্গে গাছপালা, ইনসুলেটর লিকেজসহ পরিবেশগত কারণের সম্পর্ক রয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভোল্টেজ ড্রপ। উপকেন্দ্র থেকে কোনো ফিডারের শেষ প্রান্তের দূরত্ব যত বেশি হয়, লাইনের শেষে ভোল্টেজ তত কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘ ফিডারের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়। ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অনেক সময় লোড কমানো বা লাইন ট্রিপ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। 
অন্যদিকে, কোনো কোনো ফিডারে আধুনিক অটোমেটিক প্রোটেকশন ও রিক্লোজিং ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে লাইনের ছোট একটি অংশে ত্রুটি দেখা দিলেও পুরো ফিডার বা সাবস্টেশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে একটি স্থানীয় ত্রুটি বড় এলাকার বিদ্যুত্ বিভ্রাটে রূপ নিতে পারে।
পল্লী বিদ্যুতের দীর্ঘ ফিডারে বিদ্যুত্ চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের একটি হলো ফল্টের সঠিক স্থান শনাক্ত করা। কোনো কোনো ফিডারের দৈর্ঘ্য ৩০, ৬০, এমনকি ৮০-৯০ কিলোমিটার বা তারও বেশি হতে পারে। এ ধরনের লাইনের কোথাও গাছ পড়ে গেলে, ইনসুলেটর পাংচার হলে কিংবা অন্য কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সেটি খুঁজে বের করতে লাইনম্যানদের দীর্ঘ পথ পরিদর্শন করতে হয়।
পল্লী বিদ্যুত্ ব্যবস্থায় একটি সাধারণ বিভ্রাটের প্রথমে লাইনের কোনো দূরবর্তী অংশে শর্ট সার্কিট, গাছের ডাল স্পর্শ বা অন্য কোনো ত্রুটির কারণে লাইন ট্রিপ করে। এরপর লাইনম্যানদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ত্রুটির জায়গা শনাক্ত করতে হয়। এরপর গাছের ডাল কাটা, ইনসুলেটর পরিবর্তন কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামত করা হয়। ত্রুটি মেরামতের পর সাবস্টেশন থেকে লাইন পুনরায় চার্জ করে বিদ্যুত্ সরবরাহ চালু করা হয়। অর্থাত্, বিদ্যুত্ চলে যাওয়ার পর শুধু একটি সুইচ টিপে সরবরাহ চালু করার সুযোগ সব ক্ষেত্রে থাকে না।
গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিতরণ ব্যবস্থার ওপর চাপও বেড়েছে। কোনো ট্রান্সফরমারের ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি লোড থাকলে সেটি অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। এতে ড্রপ-আউট ফিউজসহ বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার প্রত্যন্ত এলাকায় ট্রান্সফরমার বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প যন্ত্রপাতি পৌঁছানো সবসময় সহজ হয় না। স্পেয়ার পার্টসের মজুত, পরিবহনব্যবস্থা ও স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা তাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পল্লী বিদ্যুতের বিভ্রাটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতীয় পর্যায়ের উত্পাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি। দেশে জ্বালানি সংকট বা বিদ্যুত্ উত্পাদনে ঘাটতি তৈরি হলে উত্পাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় চাপ পড়ে। একই সময়ে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা বেশি থাকায় বিদ্যুত্ ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতির প্রভাব পল্লী বিদ্যুতের বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের ওপরও পড়তে পারে। বর্তমানে পিজিসিবির মাধ্যমে ৩৩ কেভির বেশ কিছু ফিডারে এসসিএডিএ এবং আন্ডারফ্রিকোয়েন্সি রিলে স্থাপনের তথ্য রয়েছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তির এই ব্যবস্থাগুলো পুরো বিতরণ নেটওয়ার্কে সমানভাবে বিস্তৃত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ফল্ট শনাক্তকরণ সক্ষমতা বাড়ানো এখনও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

সংকট যখন গভীরে তখন কি পুরো দায় বিদ্যুত্মন্ত্রীর?
এখানেই সংসদের সামপ্রতিক বিতর্ককে সস্তা মুখরোচক বিষয়ে না রেখে গভীরে যাওয়া উচিত। কারণ কোনো এলাকায় কয়েক ঘণ্টারে লোডশেডিং হলে তাত্ক্ষণিক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায়ী করা সহজ। কিন্তু একটি দীর্ঘ পল্লী বিদ্যুত্ লাইনে গাছ পড়ে যাওয়ার পর সেটি শনাক্ত করতে যদি কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, কিংবা একটি ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার পর নতুন যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে সময় লাগে-তাহলে সমস্যাটিকে শুধু মন্ত্রীর বক্তব্য বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে প্রকৃত চিত্রটি আড়ালে চলে যায়।
বিদ্যুত্ খাতের বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ফিডারের অতিরিক্ত দৈর্ঘ্য, পুরোনো বিতরণব্যবস্থা, জনবল ঘাটতি, যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং জাতীয় উত্পাদন সক্ষমতার মতো একাধিক বিষয় জড়িত। আর এতসব সমস্যা বিগত সরকারগুলোর কাছ থেকে বর্তমান সরকার প্রকৃতই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে শুধু মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী বলেই তাকে দোষারোপ করার মধ্য দিয়ে একটি কাঠামোগত সংকটকে আড়াল করা ছাড়া আর কিছুই নয়। সত্যিকার অর্থে এতসব সমস্যা যেমন দূর করতে হবে তেমনি দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন। 

সমাধানের পথ কী?
মোটাদাগে, বিদ্যুত্ সংকটে শুধু সরকার বা বিদ্যুত্মন্ত্রীকে দোষারোপ নয়; বরং তা মোকাবেলায় সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। ভোক্তা হিসেবে জনগণ, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা, সরকারি বেসরকারি সংস্থাসহ দেশের সব স্টেকহোল্ডারকেই এ সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশে থাকতে হবে। অর্থনীতিতে যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, সেটি অস্বীকার করা যাবে না কিংবা বিদ্যমান সমস্যাগুলোও অগ্রাহ্য করা যাবে না। সব কিছু বিবেচনা করেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। পল্লী বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে শুধু নতুন বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করলেই হবে না। উত্পাদনের পাশাপাশি বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নও জরুরি। যেমন-আধুনিক স্মার্ট গ্রিড, অটোমেটিক রিক্লোজার এবং ফল্ট লোকেটর স্থাপন করা হলে লাইনের কোথায় ত্রুটি হয়েছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ম্যানুয়াল পেট্রোলিংয়ের প্রয়োজন কমবে। দীর্ঘ ফিডারের সমস্যা কমাতে নতুন সাবস্টেশন ও উপকেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন। দ্রুত ত্রুটি শনাক্ত ও মেরামতে গ্রাহকসংখ্যা ও ফিডারের দৈর্ঘ্য বিবেচনায় নিয়ে জনবল বাড়ানো প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকায় ট্রান্সফরমার, ইনসুলেটর, ফিউজসহ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুত রাখতে হবে। জরুরি সরঞ্জাম দ্রুত সরবরাহের জন্য আঞ্চলিক পর্যায়ে রিজার্ভ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। 

মন্তব্য করুন